প্রচ্ছদ >> ফিচার

জ্যোতিষীরা ফুটপাত ছেড়ে অভিজাত বিপণীতে

ঢাকা: মানুষ ঠকানো খুব কঠিন কাজ। সেই কঠিন কাজ খুব সহজেই করে ফেলতে পারেন এক শ্রেণীর ব্যবসায়ী। তাদের হাতের মুঠোয় থাকে জিন-পরী। জাদুটোনায়ও অদ্বিতীয়। তাদের পরিচয়- কেউ গুরুসম্রাট আবার কেউ বা মুশকিলে আসান। নামের আগে-পিছে নানা বিশেষণ। সবাই নিজেকে দাবি করেন পীর। তবে তাদের কাজ এক: মানুষ ঠকানো। এটিকেই বেছে নিয়েছেন তারা পেশা হিসেবে। গড়ে তুলেছেন সম্পদের পাহাড়। আলিশান বাড়ি, অত্যাধুনিক গাড়ি। মানুষকে ভোলানোর সকল মন্ত্রই তাদের জানা। ব্যতিক্রমও রয়েছে এ পেশায়, প্রতারণা করতে করতে আত্ম-অনুশোচনায় পেশা পরিবর্তন করেছেন কেউ কেউ। তবে যা-ই বলা হোক না কেন, এ পেশার নামতো মানুষ ঠকানোই বটে!

এক সময় রাস্তার পাশে ফুটপাতে জ্যোতিষীদের সন্ধান মিলতো। সময়ের বিবর্তনে তারা এখন উঠে এসেছেন অভিজাত বিপণীতে। বিশেষ করে ঢাকার প্রাণকেন্দ্র বসুন্ধরা সিটিতে বর্তমান ২৪ জন মালিকের ৩৩টি জ্যোতিষ ফার্ম রয়েছে। ঠান্ডা হিমেল হাওয়ার এসব বিপণীতে এসে সাধারণ মানুষ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন অহরহ। সমস্যা জর্জরিত এদেশের সাধারণ মানুষগুলো এর সমাধানকল্পে তথাকথিত এসব জ্যোতিষীদের কাছে এসে আরো বেশি বিপদগ্রস্ত হচ্ছেন। মানুষের সমস্যা বাড়লেই তাদের ইনকাম বাড়ে। আগে এসব জ্যোতিষীদের প্রতিদিনকার ইনকাম দিয়ে পেট চালানো কষ্টকর হলেও এখনকার জ্যোতিষীরা থাকেন আলিশান বাড়িতে, চড়েন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ব্র্যান্ডের লেটেস্ট মডেলের গাড়িতে। কী নেই তাদের? অন্যলোকের সমস্যা সমাধান করার নামে অর্জিত টাকায় নিজের সব সমস্যার সমাধান করছেন।

রাজধানীর বসুন্ধরা সিটির লেভেল-১, ব্লক ডি এর ৭০ ও ৭১ নম্বর দোকান নিয়ে ২০০৯ সাল থেকে আলিশান আস্তানা তৈরি করেছেন লিটন দেওয়ান চিশতী। নিজেকে তিনি জ্যোতিষরাজ ও পীরে কামেল হিসেবে দাবি করেন। তিনি পাথর বিক্রি করে কয়েক কোটি টাকার মালিক বনে গেছেন। চড়েন পাজেরো গাড়িতে। তার শ্লোগান- আর হতাশা নয় সফলতার জন্য আসুন। তিনিও একাধিকবার আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। লিটন দেওয়ানের দাবি, যে কোন মুশকিলের আসান তিনি করে দিতে পারেন মুহূর্তেই। এ জন্য তিনি রাশি গণনা করে পাথর দেন। এছাড়া মন্ত্রের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করে থাকেন। তিনি ৯০ সাল থেকে এ পেশায় আছেন। বংশগতভাবে তাঁর এ পেশায় আসা।

তবে তিনি নিজেই বলেছেন, তার শিক্ষাগত যোগ্যতা এসএসসি পাস। যে পেশায় তিনি আছেন সে পেশায় শিক্ষাগত যোগ্যতার কোন প্রয়োজন নেই। তার আস্তানায় গেলে দেখা যায়, অনেক মন্ত্রী-এমপির সঙ্গে তার ছবি। অনেকের কাছ থেকে তিনি পুরস্কার নিচ্ছেন। তারদাবি মন্ত্রী, এমপি থেকে শুরু করে অনেক ভিআইপি তার ক্লায়েন্ট। তিনি বলেন, যে কোন মানুষের মুখ দেখেই আমি তার অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ বলে দিতে পারবো। লিটন দেওয়ানের সঙ্গে সাক্ষাতের ভিজিট ৫শ’ টাকা। তিনি ৫শ’ থেকে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন দামে পাথর বিক্রি করে থাকেন।

অনুসন্ধান করতে গিয়ে রাজধানীতে এরকম শতাধিক জ্যোতিষীর সন্ধান পাওয়া যায়। নিউমার্কেট গাউছিয়া মার্কেটের দোতলায় বসেন জ্যোতিষী প্রফেসর হাওলাদার, নারায়ণগঞ্জে বসেন জ্যোতিষী পঞ্জিকা লেখক শ্রী সুকুমার আচার্য্, মালিবাগ রেল গেটের পাশে বসেন জ্যোতিষী শিকর রায়, বসুন্ধরা সিটিতে বসেন মঞ্জু, লিটন দেওয়ান চিশতী, এস শামসুদ্দিন, শফিকুল ইসলাম সাদাত, উজ্জল আরেফীন, এ কে রায়, হাসান সেলিম, জ্যোতিষী কাউছার আহমেদ চৌধুরী, ৩১১ সি আর দত্ত রোডে পাশাপাশি বসছেন গুরুসম্রাট সাধন বাবু ও জাহাঙ্গীর শাহ চিশতী, মিরপুর শাহ আলী মহিলা কলেজ মার্কেটের দোকান নং ই/৪ দোতলায় আস্তানা গেড়েছেন এনায়েত শাহ নামের এক জ্যোতিষী বাবা। রাজধানীর শান্তিনগর প্লাজার ১২৪/৪ নম্বর হোল্ডিংয়ে আস্তানা খুলেছেন জ্যোতিষী বাবা গোলাম মওলা। তার আস্তানার নাম দরবারে নূরানী। ১৪ মোহাম্মদপুর রিং রোডে আরেকটি আস্তানার নাম রাবেয়া চিশতীর চ্যালেঞ্জ, ৮৯/১ কাকরাইলে আস্তানা খুলেছেন জ্যোতিষী দীননাথসহ আরো অনেকে।

দেশ জুড়েই চলছে এমন ভাগ্য ফেরানো পাথর ব্যবসায়ী বাবাদের আস্তানা। প্রকাশ্যে প্রতারণা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। প্রতারণা করতে গিয়ে কেউ কেউ আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে আবার নামছেন এ ব্যবসায়। জ্যোতিষী আর ভণ্ড বাবাদের নিয়ে সরেজমিন অনুসন্ধান করতে গিয়ে জানা গেছে প্রতারণার নানা কৌশল। গাবতলীতে দেখা মিললো মিথুন নামের এক জ্যোতিষীর সাথে। তিনি টিয়ে পাখির মাধ্যমে মানুষের ভাগ্য পরীক্ষা করে তার প্রয়োজনীয় পাথর দিয়ে থাকেন। তার নিজের ভাগ্য বদলাতে পেরেছে কিনা জানতে চাইলে কোন উত্তর দিতে পারেননি। বসুন্ধরা সিটিতে বর্তমান ২৪টি ভাগ্য গণনার দোকান রয়েছে। তার মধ্যে প্রথম সারির একটি দোকান "শেষ দর্শন আজমেরী জেমস হাউজ"। মালিক লিটনের সাথে দেখা করতে ৫শ’ টাকা ফি দিয়ে দেখা করতে হলো। তার রুমে প্রবেশ করা মাত্রই দেখা গেল তার চার দিকে ক্রেস আর বিভিন্ন মন্ত্রী-এমপি ও বিশেষ ব্যক্তির সাথে ওঠানো ছবি। যে কেউ গেলে এগুলো দেখেই তাকে বিশ্বাস করতে হবে। এরপর তাকে পরিচয় দিলে, নিজেকে নিরোপরাধ দাবি করে বলেন, একমাত্র সে, এখানে কাউকে না ঠকিয়ে ব্যবসা করছেন। তিনি এই প্রতিবেদককে সবগুলো ভাগ্য গণনাকারী ও পাথর ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে লিখতে অনুরোধ করেন। তবে তার ছবি তুলতে চাইলে বলেন, আমার অনেক ছবি পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে, নতুন করে ছবি প্রকাশ না করাই ভালো।
    
জ্যোতিষ শাস্ত্র থেকে ফিরে এলেন হাসান কবির। তিনিও অন্যদের মতো সাধারণ মানুষের সমস্যা দেখলে তাদের পকেট কাটতেন। এক বছর বসুন্ধরা সিটির লেবেল-৬ এ তিনি ভাগ্য বদলানো পাথর ব্যবসা করেছেন রীতিমত। অল্প সময়ে তার নাম ডাক বিভিন্ন জাগায় ছড়িয়ে পরে। প্রতিদিন তার ভাগ্য বদলানো কাস্টমারের সংখ্যা বাড়তে থাকে। মানুষ ঠকাতে ঠকাতে হটাত তার বিবেক জাগ্রত হয়। তিনি বুঝতে পারেন, এটা অন্যায়। এরপর সিদ্ধান্ত নেন তিনি আর মানুষ ঠকাবেন না। গত পহেলা বৈশাখ থেকে তিনি এ ব্যবসা বন্ধ করে দিয়েছেন। এখন তিনি চেষ্টা করছেন, সাধারণ মানুষ যেন প্রতারিত না হয়।
ইসলামের দৃষ্টিতে জোতিষ শাস্ত্র- যারা পাথরের ব্যবসা করছে, তারা বিশেষ করে ইসলাম ধর্মের দোহায় দিয়ে মানুষকে প্রতারিত করে। যাদু, ভাগ্য গণনা, গণক, জ্যোতিষী, যাদুকর ও ভেলকিবাজ ফকিরের শরণাপন্ন হওয়ার ব্যাপারে হুঁশিয়ার করে লালবাগ শাহী মসজিদের ইমাম বলেন, প্রথমত ইসলামে ধোঁকাবাজদের কোন জায়গা নেই দ্বিতীয়ত আল্লাহকে দূরে ঠেলে দিয়ে রিযেক ও ভাগ্য বদলানোর জন্য পাথরকে বিশ্বাস করলে আল্লাহর সাথে শিরেক করা হবে। আর আল্লাহ তায়ালা সব গোনাহ মাপ করলেও শিরেক মাপ করবেন না। তাই মুসলমানদেরকে এই ফিতনাহ থেকে সতর্ক থাকতে হবে।
জ্যোতিষ শাস্ত্র কি বিজ্ঞান? এ প্রশ্ন যেমন আগেও ছিল এই একবিংশ শতাব্দীতে আছে। বিজ্ঞান পরীক্ষা-নিরীক্ষা, তত্ত্ব-উপাত্তের মধ্য দিয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিজ্ঞান পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে রহস্য উম্মোচন করে। বিজ্ঞানের বিভিন্ন পর্যায়কে ভাগ করলে যে আটটি ধাপ পাওয়া যায়। সেগুলো হলো- (১) পর্যবেক্ষণ, (২) তুলনাকরণ, (৩) শ্রেণিকরণ, (৪) পরিমাণ নির্ধারণ, (৫) পরিমাপন, (৬) পরীক্ষা-নিরীক্ষা, (৭) সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও (৮) ভবিষ্যদ্বাণী করণ।

2014-01-15-00-32-47 পৃথিবীর সৃষ্টিলগ্ন থেকে মানুষ ধাপে ধাপে উন্নতির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। সভ্যতার পরিবর্তন হচ্ছে মানুষের উন্নতির মাধ্যমে। যে কাজ নিজের কল্যানের তা অন্যেরও কল্যানের। সেজন্য পুরাতন সমাজ ব্যবস্থার পরিবর্তন ঘটে নতুন সমাজ ব্যবস্থার সৃষ্টি হচ্ছে। মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম-সে উন্নতির চরম শিখরে পৌঁছাতে চায়, ধর্ম-বর্ন-গোত্র নির্বিশেষে সকল মানুষের চাওয়া। শিশুকাল থেকেই...
     
 
এই বিভাগের সর্বশেষ আপডেট